আগের পাতায় একটা জিনিস লক্ষ করেছ? সুরটা যে বসানো হচ্ছে সেটা কিন্তু গানের কথাতে নয়,
সুরটা আমরা বসাচ্ছি
আওয়াজের খণ্ডগুলোতে৷ যেমন ধরো কারার ওই লৌহ কপাট গানটায় এক জায়গায় আছে
হা হা হা পায় যে হাসি
ভগবান পরবে ফাঁসী
সর্বনাশী শিখায় এ হীন তথ্য কে রে?
এই তৃতীয় ব্যাপারটা টুং টাং করার জন্য খুব কাজে দেয়৷ একটা উদাহরণ দেখি৷ এই যে এক্ষুণি নজরুলের
গানের সুরের উদাহরণ দিলাম, সেই একই সুরে কয়েকটা ফচ্কেমি কথা বসিয়ে দিই--
হা হা হা পায় যে হাসি
বাঘ আজ বাঘের মাসী
হালুম ছেড়ে মিঁয়াও করে গুমড়ে মরে ৷
একই সুর বসালে হবে--
আচ্ছা এই রকম ফচ্কেমি কত দূর অব্ধি করা যায়? যে কোনো কথায় যে কোনো সুর বসানো যায় কি?
না, কারণ আওয়াজের খণ্ডের সংখ্যা মিলতে হবে৷ কিন্তু যদি সেটুকু মেলে তবেই কি কাজটা করা যাবে? একটা
চরম উদাহরণ নিয়ে দেখি৷ আমরা রামগরুড়ের ছানা গাইব কারার ওই লৌহ কপাটের সুরে৷ সুরটা নেব এই লাইনটা থেকে-
রক্তজমাট শিকলপূজার পাষাণ বেদী ৷
এতে ঠিক বারোটা আওয়াজের খণ্ড আছে-
রক্তজমাটশিকলপূজারপাষাণবেদী
এই সুরটা বসাব এই লাইনে--
রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা
এখানেও আওয়াজের খণ্ডের সংখ্যা বারো-
রামগরুড়েরছানাহাসতেতাদেরমানা
গেয়ে দেখার চেষ্টা করলেই বুঝবে কাজটা করা যাচ্ছে,
কিন্তু ঠিক ভালো শোনাচ্ছে না৷ মাঝে মাঝে কয়েকটা জায়গা কেমন যেন চেপে যাচ্ছে, যতটা সময়
নিয়ে কথাগুলো বললে ভালো শোনাত, সুরটা ততটা সময় দিচ্ছে না৷ এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ৷
তোমার যতটা সময় দিতে ইচ্ছে করে ততটাই দাও, খালি রীডগুলো একই টেপো৷ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করবে
যে এর ফলে কারার ওই লৌহ কপাটের অতি পরিচিত সুরটা এই সামান্য সময়ের পরিবর্তনেই সম্পূর্ণ অন্যরকম
শোনাচ্ছে! তুমি যাকে খুশী বল যে এটা তোমার নিজের দেওয়া সুর৷ লোকে সুরটাকে আহামরি বলবে না, কিন্তু
নিতান্ত সূক্ষ্মকর্ণ না হলে ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করবে না যে, এটা পুরোটাই চোরাই মাল!
পুরনো সুরে নতুন শব্দ বসাতে গেলে অনেক সময়ে দেখবে যে, খণ্ডগুলো সামান্য অন্যরকম হচ্ছে৷
যদি খণ্ডের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে থাকে, তবে মাঝে দু একটা বাড়তি সুর ঢুকিয়ে দিতে হয়৷
যেমন ধরো 'নাচ ময়ূরী নাচ রে' গানটার এক জায়গায় আছে--
উড়ল আঁচল মেঘ বিজুরী ঝিলমিলিয়ে হাসে৷
এর সুরটা এইরকম--
খানিক পরেই আছে--
কার তরে ও মন বিবাগী কোন সে ব্যথা অন্তরে৷
এটারও একই সুরে বাজাতে হবে, কিন্তু এখানে আওয়াজের খণ্ড একটা বেশী৷ তাই এবার সুরটা নেব এইভাবে--
এখানে বাড়তি খণ্ডটাকে লাল গোল দিয়ে দেখিয়েছি৷ কী করে বুঝলাম এই নতুন খণ্ডটায় কী সুর দেব?
উত্তর সহজ--দু প্রান্তে কী কী সুর আছে দ্যাখো৷ প্রথমে সেই দুটো চেষ্টা করে দ্যাখো ভালো শোনায়
কিনা৷ নেহাত যদি না শোনায় তবে মাঝের সুরগুলো চেষ্টা করে দ্যাখো৷
এর ঠিক উল্টো উদাহরণ ছিল 'বাঘের মাসী'-র উদাহরণটায়৷ মূল গানে যেখানে ছিল ভগবান, সেখানে আমাদের প্যারোডিতে ছিল মোটে দুটো খণ্ড বাঘআজ৷ এখানে আমরা
ভ-এর জায়গায় বাঘ এবং বান-এর জায়গায় আজ বসিয়ে দিয়েছি৷ মাঝের গ-টা বেমালুম লোপাট!
অসুররাও যা করে উঠতে পারে নি, সুরের জগতে তা অনায়াসে করা যায়-- ভগবানের পেট কাটা!