লোকটাকে দেখেই আমি সতর্ক হলাম৷ তাড়াতাড়ি সরে পড়া ছাড়া পথ নেই৷ তার দুটো কারণ৷ এক, লোকটা আমাকে দেখে ফেললে ঠিক
কী যে করে বসবে কল্পনা করাও কঠিন৷ আর দুই, লোকটাকে দেখেই আমার পেটের ভিতরে যে হাসিটা জমতে
শুরু করেছে সেটা ভয়ানক হো হো শব্দে ফেটে পড়ার আগেই রঙ্গমঞ্চ থেকে কেটে পড়তে হবে৷ অতএব চট্ করে দুই পথচারীর
আড়াল দিয়ে সরে পড়লাম৷
এই হল গল্পের শেষ৷ কিন্তু লোকটা কে, এবং কেনই বা তাকে দেখে আমার এরকম আশ্চর্য মনোভাব
হল, সেটা জানতে হলে গল্পের শুরুটাও জানা দরকার৷ যদি আপনার হাতে সময় থাকে, তবে সেটা শুনেই
যান৷ কারুর সঙ্গে রহস্যটা ভাগ করে নিতে পারলে, আমিও খানিকটা বাঁচি৷
***
অবশ্য গোড়াতেই মিছে আশ্বাস দেওয়া হয়ে গেল৷ লোকটা যে ঠিক কে, সেটা আমি নিজেও মোটেই জানিনা৷ খালি জানি সেদিন, মানে গেল
সপ্তাহের বিষ্যুদবারের রাত এগারোটার সময়ে লোকটা ডানকুনি লোকালে চেপে যাচ্ছিল৷ সপ্তাহের বারটা
আমার দিব্যি মনে আছে, কারণ সেই ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক তার আগের দিন সন্ধ্যাবেলায়৷ লোকটা কোথা
থেকে উঠেছিল জানি না, তবে নেমেছিল
বরানগরে৷ আমি তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেছিলাম৷ কেন ওই
সময়ে স্টেশনে বসেছিলাম, সেটা আপনি আন্দাজ করতে পারবেন না৷ তবে সেটা প্রাসঙ্গিক নয়৷ প্রাসঙ্গিক
খালি এটাই যে, লোকটাও আন্দাজ করতে পারে নি৷ খালি ট্রেন থেকে
নেমে দেখল নির্জন স্টেশনে একটা মাত্র মানুষ বেঞ্চে বসে আছে৷
আমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না৷
কারণ মাথার উপরে মেঘছেঁড়া চাঁদের
আলো নামতে গিয়েও নামতে পারে নি, ওভারব্রীজের ভাঙা তারজালির গায় আটকে গেছে৷
পরিস্থিতিটাকে বেশ ছমছমে বলা যায়, খালি মাঝে মাঝেই বি টি রোড দিয়ে
ভারী ভারী লরীর শব্দে সেটা খানিকটা ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল৷ আমি লোকটাকে দেখেছিলাম নামার সাথে
সাথেই৷ গোটা ট্রেন থেকে আর কেঊ নামেনি৷ এই একজন ছাড়া, তাই চোখে না পড়ার কোনো কারণ ছিল না৷
দেখেও চুপচাপ বসেছিলাম৷ লোকটাকে ডাকিনি, হাত নাড়িনি, তাকাই নি পর্যন্ত৷ কিন্তু লোকটাই
খানিকক্ষণ এদিক ওদিক চেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল৷ সত্যি বলছি, নিজে থেকেই এসেছিল৷ আমি একটুও
প্ররোচনা দিই নি৷ এসে জিজ্ঞাসা করল টিকিট কাউন্টারটা
কোন দিকে৷
আমরা ছিলাম এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে৷ টিকিট কাউন্টারটা এখান থেকে দেখা যায় না৷ এক নম্বর কেন, দু নম্বর থেকেও দেখা যায় না৷
কোন দিক দিয়ে স্টেশন থেকে বেরোতে হবে, সেটাও ঠাহর করা কঠিন৷ বিশেষতঃ এই নিশুত রাতে৷ তাই
প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক৷ এই প্রশ্ন আমি অন্যের মুখেও শুনেছি আগে, মানে বুধবারের ঘটনাটার
আগে৷ আমি হাত তুলে দেখিয়ে দিলাম টিকিট কাউন্টারের দিকটা৷ দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে
খানিকটা নেমে গেলে পাওয়া যায় ওটা৷ লোকটা খানিকক্ষণ অসহায়ের মত আমার আঙুল দেখানো পথের দিকে তাকাল৷ যে
দিকে আঙুলটা বাড়িয়েছি সেটা দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিক, এই প্ল্যাটফর্ম আর ওই খানিক দূরের টিমে
টিমে আলোয় আলোকিত দুই সংখ্যা লেখা বোর্ডটার মাঝে আপাততঃ নিকষ কালো অন্ধকার৷ যেটুকু আলো পড়তে
পারত, সেটা আড়াল করে দাঁড়িয়ে রায়েছে ওভারব্রীজের কুৎসিত দর্শন অবয়বটা৷ কালো আকাশের সামনে
আরো ঘন কালো একটা দৈত্যের মত৷ দুই প্ল্যাটটফর্মের মাঝের ওই অন্ধকার অংশে খালি চিকচিক
করছে রেলের লাইন দুটো, ইস্পাতের দুটো ছুরির মত৷ সে দিকে একবার অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে লোকটা
ফের বলল, কীভাবে যাব?
এ পর্যন্ত আমি কিন্তু লোকটাকে নিয়ে তেমন মাথা ঘামাইনি৷ আমার মনে তখনো বুধবারের ঘটনাটা রেশ
চলছিল৷ কিন্তু এই ''কীভাবে যাব?'' প্রশ্নটায় আমার যেন সম্বিত ফিরল৷ ভিতর থেকে একটা চাপা হাসি
গুঞ্জন করে উঠল৷ রহস্যপূর্ণ গলায় বললাম, হাতে সময় থাকলে ওই ওভারব্রীজ দিয়ে যেতে পারেন৷ সেটাই নিরাপদ, অবশ্য--
অন্ধকারে লোকটার মুখভঙ্গী অস্পষ্ট৷ গলার রহস্যটা আরো বাড়ানো উচিত কিনা বুঝছিলাম না৷
--অবশ্য অনেকেরই তাড়া থাকে, যদি আপনারও নিতান্ত তাড়া থাকে যাবার জন্য, তবে ওই দিকে
প্ল্যাটটফর্মের ঢালু অংশ দিয়ে নেমে লাইন পার করেও যেতে পারেন৷ তবে--
নাঃ, আমার গলার রহস্যে কাজ হয়েছে৷ লোকটা খানিকটা কাঁপা গলায় বলল, তবে?
না, তেমন কিছু নয়, খালি যদি কোনো ট্রেন আসে৷
ওঃ, লোকটা যেন একটু স্বস্তি পেল৷ ট্রেন আসার ভয়ে লাইন টপকে পেরোনো থেকে কবে কোন ভারতীয় বিরত হয়েছে? প্ল্যাটটফর্মের
ঢালু প্রান্তের দিকে পা বাড়াল লোকটা৷
আমি উঠে দাঁড়ালাম৷ বললাম, এখন অবশ্য আর কোনো ট্রেন নেই, তাও সাবধান হওয়াই ভালো৷ গেল
বুধবারের ঘটনাটা জানেন তো? লোকটা মুহূর্তের জন্য থমকালো মনে হল৷ কী ঘটনা? মনে করার
চেষ্টা করছে৷ আমি অপেক্ষা করছি৷ মনে পড়বেই৷ না পড়লে আমিই পড়িয়ে দেব৷ তার অবশ্য দরকার হল না৷
ও হ্যাঁ সেই ঘটনাটা বলল লোকটা৷ এখনেই বুঝি?
হ্যাঁ ঠিক ওখানেই , জায়গাটা ভালো করে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিই আমি৷ ঠিক ওই ঢালু জায়গাটার পরেই৷
ইশ্৷ বেশী বয়স ছিল না শুনলাম৷
নাঃ, বেশী নয়৷ কলেজে পড়ত৷ তারপর কিছুক্ষণ থেমে থেকে যোগ করলাম, ঠিক আমারই মতন৷
লোকটা থমকালো৷ সেটা আমার কথায়, নাকি আমার কন্ঠস্বরে, বলা
কঠিন৷ খানিকক্ষণ হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল আমার দিকে, তারপর ঢালু জায়গাটার দিকে৷
ওই ঢালু জায়গাটার সাংঘাতিক রক্তলোলুপতা এক বলিতেই
চরিতার্থ হয়েছে কিনা, বোধয় সেটাই ভাবছে৷ একবার ওভারব্রীজটার দিকে তাকাল, যেটা
মেঘ-ছেঁড়া চাঁদের সামান্য আলোটুকুও শুষে নিষ্ঠুর রহস্যের মত দাঁড়িয়ে আছে৷ বোধহয়
ভাবছে ওভারব্রীজ দিয়েই যাবে৷ শেষ পর্যন্ত আবার আমার দিকে চাইল৷
লোকটার চোখ দিয়ে নিজের দিকে তাকালাম৷ ঠিক সেই ঘটনাটার ছেলেটার মতই একটা ছেলে৷ আপাততঃ অন্ধকারে ওর সামনে
দাঁড়িয়ে আছে৷ অন্ধকারে
কেউই কাওউকে দেখতে পাচ্ছি না৷ তবু আমি হলপ করে বলতে পারি লোকটা ঢোঁক গিলছে৷
যখন কথা বলল, তখন ওর গলায় ভয়ের ভাব সুস্পষ্ট৷
এখন তো আর কোনো আপ ট্রেন নেই৷
হাসি পেল, যেন বিপদ খালি আপ ট্রেনেই আসে৷ লোকটা আমার কাছে একটু অভয় শুনতে চাইছে৷ এক
মুহূর্ত দ্বিধান্বিত হয়ে রইলাম৷ আমার পেটের মধ্যে সেই হাসির গুঞ্জনটা ফের উঠতে লাগল৷ বললাম,
না, এত রাতে ডাউন ট্রেনও নেই৷ আপনি নির্ভয়ে চলে যান৷ তাছাড়া--
তাছাড়া?
তাছাড়া সত্যি বলছি, খুব ব্যথা লাগে না৷
লোকটা যদি কথা বলতে পারত, তবে বলত-- মানে? কিন্তু আমার কন্ঠস্বরে ওর হাঁ মুখ দিয়ে কোনো
কথা বেরোচ্ছে না, খালি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে৷ চক্ষু বিস্ফারিত৷
হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, সত্যি বলছি, আপনি নির্ভয়ে চলে যান, যদি ট্রেন আসেও, কোনো কষ্ট লাগবে না
আপনার, আর--
আর? লোকটা অতি কষ্টে শব্দটা উচ্চারণ করতে পারল৷
আর আমিও একটা সঙ্গী পাব৷
এতটা নাটকীয় না হলেও চলত৷ কারণ লোকটা আমার সংলাপটা পুরো শেষ হবার আগেই ভির্মি খেল৷ ঠিক
এভাবে লোকে ভির্মি খায় জানা ছিল না৷ ভাগ্য ভালো পড়বার সময়ে মাথাটা প্ল্যাটটফর্মের সিমেন্টের বেঞ্চে ঠুকে যায় নি৷ নইলে
একটা কেলেংকারী হত৷ আমি লোকটার অচৈতন্য দেহটা ঠিক করে শুইয়ে সঙ্গের বোতল থেকে খানিকটা জল
ছিটিয়ে দিলাম ওর চোখে মুখে৷ তারপর জ্ঞান হবার আগেই অদৃশ্য হলাম৷
***
বরানগর স্টেশনে ভূত দেখার গল্পটা ভালোই চাউর হয়েছিল৷ দুয়েক জন আমাকেও বলেছে৷ আমি
মনে মনে বেজায় হেসেছি৷ কিন্তু শেষটায় এভাবে লোকটার মুখোমুখি পড়ে যাব ভাবি নি৷ যদি চিনে
ফেলে, তবে সত্যিই ভূত না বানিয়ে ছাড়বে না৷
মন্তব্য
নীচে একটা মন্তব্য দেওয়ার জায়গা রয়েছে. দেখে মনে হবে যেন তার জন্য আগে log
in করতে হবে. যদি তাতে আপত্তি থাকে, তবে ওই "Name"-এর জায়গায় একবার
click করলেই "I'd rather post as a guest" বলে একটা option আসবে.